চড়া শাকসবজিসহ সব কাঁচা পণ্যের বাজার


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৩১, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
 চড়া শাকসবজিসহ সব কাঁচা পণ্যের বাজার

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও বন্যায় বিপর্যস্ত দেশের পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। সেই তুলনায় রাজধানীতে তেমন কোনো সংকট না থাকলেও চড়া শাকসবজিসহ সব কাঁচা পণ্যের বাজার। ১০০ টাকার নিচে ভালো মানের সবজি মেলাই ভার। এ অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যের কারণ জানতে চাইতেই বৃষ্টি-বন্যাকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ক্রেতাদের প্রশ্ন আড়তদারদের নৈতিকতা নিয়ে— বর্ষার প্রভাব সীমান্ত এলাকায় হলেও বাজারে কেন দাম বাড়বে? ওই এলাকা থেকে তো আর শাকসবজি আসে না।

ভোক্তাদের এমন সরল প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি নয় কেউ। তবে আছে নিত্যনতুন অজুহাত অসিলা। সবজি বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় কৃষকের ক্ষেতের সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কমে গেছে সরবরাহ। কাঁঠালবাগানের স্বপনের মোড়ে সবজি বিক্রেতা রিয়াজুল হকের ভাষ্য, ‘আমরাও বেশি দামে কিনে আনছি। মানুষও জানে বৃষ্টির সময় দাম বাড়ে। সবচেয়ে বেশি দাম এখন গোল বেগুনের।’

তবে ব্যবসায়ীদের এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অনেক সময় অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে বাজারে আদায় করা হয় অতিরিক্ত দাম। কারওয়ান বাজারের সুফিয়া বেগমের আক্ষেপ, বৃষ্টি হলেই সবজির বাজারে লাগে আগুন; কিন্তু আমাদের বেতন তো বাড়ে না। সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে মাসের অর্ধেক টাকা।

শাকসবজির দাম চড়া হওয়ায় কাটছাঁট হচ্ছে বাজারের তালিকা, টান পড়েছে মানুষের খাবারের পাতে। আগে সবজিসহ একাধিক তরকারি খাওয়ার সুযোগ হলেও এখন অধিকাংশ মধ্যবিত্ত এবং সব নিম্নমধ্যবিত্তের থালে একাধিক তরকারি মেলা যেন সৌভাগ্য। আর নিম্নবিত্তের কাছে তরকারি পাওয়াই আনন্দের।

কাঁঠালবাগানের একটি ছোট হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে এসে রহমান নামের নিয়মিত ক্রেতার অভিযোগ, আগে ভর্তা আর তরকারি বেশি দিতেন, এখন এত কম কেন? হোটেলের কর্মচারী শফিকের জবাব, ‘ইচ্ছা করে কম দিচ্ছি না ভাই, সবজির দাম এত বেড়েছে যে আগের মতো দিলে দোকান চালানোই অসম্ভব।’

একটি ছোট হোটেলের এ দৃশ্যই এখন রাজধানীর সামগ্রিক বাস্তবতা। টানা এক মাসের বৃষ্টিপাত, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা এবং সরবরাহব্যবস্থার অজুহাতে ঢাকার বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। এর প্রভাব শুধু নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘরেই নয়, পড়েছে হাজারো ক্ষুদ্র হোটেল, ভাতের দোকান ও রেস্তোরাঁর ওপরও। একদিকে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা একই দামে খাবার বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই খাচ্ছেন হিমশিম।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, গোল বেগুন প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ এবং লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। করলা, বরবটি ও কাঁকরোলের কেজি ১০০-১২০ টাকা। কচুর লতি ৯০-১০০, ধুন্দুল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, পটোল ও ঢেঁড়স ৬০-৮০ টাকা। প্রতি পিস লাউ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৭০-৯০ টাকা। বর্ষার বাজারে কিছুটা কমে মিলছে শুধু পেঁপে, যার কেজি ৩০-৪০ টাকা। অথচ মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও এসব সবজির অনেকটি ২০-৩০ টাকা কম দামে পাওয়া যেত। হাতিরপুলের বাজারে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮৫০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় স্থির। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ ও কক মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সবজির মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ছোট হোটেলগুলোয়। কাঁঠালবাগানের পেপার গলির শাহজালাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের কর্মী শফিকের ব্যাখ্যা, আগে প্রতিটি প্লেটে যে পরিমাণ তরকারি দেওয়া হতো, এখন তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ গোল বেগুন কিনতেই চলে যায় অনেক টাকা। ভর্তা বানালে আগের মতো পরিমাণ হয় না; কিন্তু কাস্টমার তো বুঝতে চান না। কম দিলে আবার বলেন, ‘আরেকটু দেন।’ একই দামে ব্যবসা চালিয়ে লাভ করা তো দূরের কথা, দোকান টিকিয়ে রাখাই কঠিন।

ভ্যানে রুটি আর সবজি বিক্রি করেন হাসিনা বেগম। তিনি বললেন, ‘আমি সবজির পরিমাণ আগে থেকে কমিয়ে দিয়েছি। পাশের দোকানে সবজির পরিবর্তে ডাল দিতেও দেখা গেছে।’

ডিম-মুরগিতেও বাড়তি চাপ: ফার্মের সাদা ডিমের ডজন ১২০-১৩০ এবং বাদামি ডিম ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০-১৯০ এবং সোনালি মুরগি ৩৩০-৩৪০ টাকা। গরুর মাংস ৮৫০ এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় স্থির থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা এখনো নাগালের বাইরে।

পেঁয়াজে উল্টো সংকট: কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আলমাছ জানিয়েছেন, কৃষক পর্যায়ে বৃষ্টির কারণে অনেক পেঁয়াজ পচে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদক লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষক ১০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। অনেক পেঁয়াজ ৫ টাকায় ছেড়ে দিচ্ছেন। এখন দাম বাড়বে না, তবে কৃষকের মজুদ শেষ হয়ে গেলে বাজারে আবার ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। তিনি বলছিলেন, ‘আমি ৪০-৪৩ টাকা পাইকারি বিক্রি করতেছি।’

কাঁঠালবাগান বাজারে ভ্যানে করে আলু আর পেঁয়াজ বিক্রি করছেন রবিন মিয়া। তিনি বললেন, ‘প্রতি কেজি ৫৫ টাকায় বিক্রি করছি কিন্তু কেউ দুই কেজি নিলে ১০০ টাকায় নিতে পারবে।’ রাশেদা বেগম পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনেছেন। তিনি বললেন, ‘পেঁয়াজের দাম এখনো কিছুটা কম। এটা পরিবারে একটু বেশি লাগে তাই এত কিনলাম। সবজির তুলনায় একটু কম।’

কারওয়ান বাজারের আড়তদার গাউছিয়া ভাণ্ডারের মালিক মোস্তফা কামালের ভাষ্য, সবজির দাম বাড়ার মূল কারণটাই হলো বৃষ্টি আর বন্যা। এর কারণে সব সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও অনিয়ম বা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে নেওয়া হচ্ছে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বন্যা হলো দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে আর এ অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এটি খুবই দুঃখজনক। তবে আমাদের ব্যবসায়ীরা সবসময় অজুহাতের জন্য ওত পেতে থাকেন। কীভাবে মানুষের পকেট কাটা যায় সে চিন্তায় মগ্ন থাকেন। সুযোগ এলেও তা হাতছাড়া করতে নারাজ। বৃষ্টি, বন্যাসহ নানা অজুহাতে মানুষের পকেট কাটা এটি ব্যবসায়ীদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে।’ তিনি জানালেন, এ অবস্থা দূরীকরণে ব্যবসায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বিশ্ববাজার বা সত্যিকারের কোনো কারণে দাম বেশি নেবে আর কমলে দাম কমাবে। এটা বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

Link copied!